
গত একবছর ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিদৃশ্য এমন এক সংকটকালীন গতি অর্জন করেছে, যা কেবল আমাদের ইতিহাসকে বদলাচ্ছে না, বরং ভবিষ্যতের নকশাকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অর্থনৈতিক সূচকে মন্দা, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামাজিক পুনরুজ্জীবনের আশা — সব মিলিয়েই আমরা এখন এক নব-চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছি।
প্রথমত, অর্থনীতির গতি আশঙ্কাজনকভাবে ধীর: বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি বাংলাদেশের জাতীয় উৎপাদন চাহিদা কমে আসবে এবং এই অর্থবছরে GDP প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩.৩ প্রতি-শতকে নেমে আসতে পারে উল্লেখ করেছে। এই প্রবৃদ্ধি গতকালের উচ্চমুখী লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক পিছিয়ে — এবং এটা স্পষ্ট সংকেত যে বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখন ঝুঁকির পথে।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিপ দেখায় যে দাম বৃদ্ধির (মুদ্রাস্ফীতি) চাপ জনগণের জীবনে গভীর ব্যথা দিচ্ছে। EIB-এর এক সমীক্ষা অনুযায়ী, যথেষ্ট বড় অংশ মানুষ মনে করছে মুদ্রাস্ফীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ২০২৫ সালের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারও বাজেট সংকুচিত করছে — পরিকাঠামোগত ব্যয় কমানো হচ্ছে এবং দারিদ্র্য-উদ্বাহনমূলক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে নির্দেশনা সীমিত করছে। এতে স্পষ্ট যে, নির্ভরযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক মডেল পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক অস্থিরতা অধিকতর জটিল রূপ ধারণ করেছে। ২০২৪–২৫ সালে সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই রাজনৈতিক উত্তেজনা থামেনি। বিরোধী দলে এবং জনগণের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে যে গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক স্থায়ীত্ব একসাথে ভবিষ্যতে নিরাপদ থাকবে কি না।
অতএব, আগামী জাতীয় নির্বাচন (যা এখন ২০২৬ সালের এপ্রিল-এ নির্ধারিত করা হয়েছে) কেবল রাজনৈতিক রাজনৈতিক ছন্দপতন নয়, বরং একটি অক্সিজেন—রিপ্রাইজাল হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই নির্বাচনের পথ ও সম্পাদন যদি স্বচ্ছ না হয়, তবে দেশের গঠনমূলক উন্নয়ন প্রকল্প, আস্থা ও সামাজিক সংহতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
তৃতীয় এক উদ্বেগকর দিক হলো ধর্মীয় ও সামাজিক উত্তরবাদের পুনরাবির্ভাব। একবছর আগে যে ছাত্র-নেতৃত্বের আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তার প্রতিফলন হিসেবে ধর্মানুগ ইসলামিক গ্রুপগুলোর রাজনৈতিক শক্তি বাড়ছে। কিছু বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশকে একটি ধ্রুপদী ইসলামিক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় ঠেলে দিতে পারে, যদি সুসংগঠিত গণতান্ত্রিক চর্চা ও সীমিত স্বচ্ছতা বজায় না রাখা যায়।
যাই হোক, শুধু সমস্যা-চিত্র নয়, সম্ভাবনার চিহ্নও আছে। বিশ্বব্যাংক মনে করছে, যদি বাংলাদেশ সময়োপযোগী নির্ধারক সংস্কার আনার ক্ষেত্রে সাহস দেখায় — বিশেষ করে আর্থিক খাত ও কর ব্যবস্থায় — তাহলে মধ্যম মেয়াদে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার সম্ভব। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি কিছুটা শক্তিশালী রয়ে গেছে, যা দেশকে ঝুঁকি-সামলে রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
সুতরাং, বাংলাদেশের বর্তমান সময়টি একটি সংকট ও পরিবর্তনের মোড় — এবং আমাদের সামনে এক স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়েছে: কি আমরা এগুলোকে বিপর্যয় হিসেবে দেখব, নাকি এক নতুন গঠনমূলক অধ্যায়ের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করব?
যদি নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক চুক্তি, সামাজিক সংহতি ও অর্থনৈতিক সংস্কারকে একত্রে এগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে দেশের অহংকার, সামর্থ্য ও জনগণের আশা নতুনভাবে প্রস্ফুটিত হতে পারে। অন্যথায়, আমরা একটি বড় সুযোগ হারাতে গিয়ে, অস্থিরতার গর্তে ধরা দিতে পারি।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ এম আর মাহফুজ । নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ নাছির উদ্দিন। বার্তা সম্পাদকঃ ইঞ্জিঃ এম এ নাছের অর্পণ
দৈনিক ন্যায়ের ডাক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত@২০২৫